CHOSHMA
প্রিয় মানুষকে পরিচিত কথা বলার জন্য আরও পরিচিত হবো ভাবতে ভাবতেই আর একটা অপ্রিয় আগন্তুক ' ছুঁ ' মেরে আমার ভালোবাসা কে নিয়ে চলে যায়। ভেঙে যায় অনেক সম্পর্ক। আমি সেই সমস্ত লেখক দের হৃদয়ে প্রবেশ করার বহুবার চেষ্টা করেছি, যাঁরা লিখতে লিখতে তাঁদের ভেতরের মানুষকে আর খুঁজে পায়না, তাঁরা অন্যের জন্য লিখেই যায়। নাহ্ ভাই! আমার লেখা অতটাও হৃদয়মর্মী বা কখনও কখনও হৃদয় বিদারক টুকু হতে পারে তার সম্ভাবনা দেওয়ার জো আমার আছে। বিশ্বাস আছে আজকে যা শিখলাম বাস্তবের জীবন থেকে তার ক্ষণিকাংশ যদি তোমার বা তোমাদের চোখের চশমার পেছনের সত্যিকারের ব্যক্তিত্বকে উপহার দেই তোমরা এতটাও ইতস্তত বোধে আমার লেখাকে তিক্ত বলে উপযুক্ত শাস্তি হিসাবে আবার আমার বইতে বার বার ফিরে আসতে চাইবেনা!
নমস্কার! আমি তোমাদের বাঙালিবাবু! আমার ডেরায় তোমাদের একবার আমার ঘটনা শোনাতে চাই!
আমি তখন ছোট্ট বছর সাতেকের একটা মর্কট মির্ধা জন্তর মন্তর থেকে আগন্তুক উৎপটাং হরকত কারী হিসাবে খুবই বিপজ্জনক কাণ্ড গুলো ঘটানোর ব্যস্ততার মাঝে এই নিমিত্ত সুযোগ পেয়েছি, দাদ্দুর সাথেই বাড়ির পেছনে রতন দের পাড়ায় কালীপুজোর পরে পরেই আদিবাসী নৃত্যানুষ্ঠান আর জাঁক জমক পূর্ণ আপ্যায়ন নিতে ব্যস্ত। আবারও বলে রাখি ছোটবেলা থেকেই বাপি আর দাদ্দুদের প্রভাব ছিল মস্ত পাশাপাশি গ্রাম তথা সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে সমাজের অতি সহজ সাধারণ ভাবে জীবিকার ধার ধরানো প্রতিটি মানুষের সাথেই। দাদ্দুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আমিও বড় হয়ে তাঁর সৃষ্টি করা পূর্ব আভিজাত্যের পরম্পরাভোগী হবো হয়তো। কিন্তু সেদিনের কিছুটা সময় আমার আরও উৎকন্তী জীবন কে জানিনা আরও যে কি হবে উৎসুক করে তুললো সেই টক দই আর চিনি মাখানো চিড়ে চিবোতে চিবোতে আমার লক্ষ্য গেলো রতনের দাদু শ্রদ্ধেয় মীর্জা মান্ডি র দিকে!
বয়স দেখে মনে যেটুকু হয়েছিল ওই হাতে গুণে শুরু করলে আপাতত সত্তর বা তিয়াত্তরের বেশি নয়। ধিতাং ডং ধীরঙ ধুম ধীতাং ডং এই মাদলের শব্দে ভেদে কখন জানিনা মশালের শীর্ষে প্রাচ্য সন্ধ্যায় উন্মুখ তীব্র ভাবে লাল উত্তপ্ত বেগুন পড়ার মতো শেষ নিশ্বাস নিতে থাকা অবস্থার বক্তিতে তাঁর ধনুকের মাথাটা লাগিয়ে জ্বালিয়ে নিয়েছে! ততক্ষণে মাঠের ওপাশের মায়েরা হোরে হর হুং হন নাহ্ নঃন্হ বলে হওন বলতেই একটা সোরাত করে শব্দ হলো, আর ধনুক থেকে বেরিয়ে আসা আগুনের ফুলকি মাখানো সেই বান টা লাগলো একটা সত্যিকারের হোলির গায়ে! দেখলাম একটা নতুন রাবণ পোড়া, দেখলাম একটা নতুন হোলিকা দহন!
এবারে শুরু আসল ঘটনা! এতক্ষণ অবধি সব কিছুই ঠিক থাকবে সেটা তো সাধারণ মানুষ হিসাবে তুমি আমায় জানবার পূর্বে আশ্বাস রাখতেই পারো তাই না!
চিন্তা নেই! শনিবারে র দুপুরে টিউশন টা ছুটির পরে আমি যে বুদ্ধি টা আঁটলাম এবারে তার বহিঃপ্রকাশ হবে রবিবার দিন ঠিক সন্ধ্যা বেলার আগে আগে - - -
আমি সে ধনুক বানের অতিরিক্ত প্রভাব একেবারে বাস্তবায়ন করার জন্য উন্মত্ত! সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রাক্তন হিসাবে সকালের কাজ গুলো সারার পরেই ছুটির দিন উপভোগ করার জন্য আমার সহকর্মী হিসাবে ছোটবেলার সেই বন্ধু খুড়ো (সুমন গুড়ে) ব্যক্তিটিকে সঙ্গে নিয়ে চললাম দাদ্দুর নিজ হাতে তৈরি করা বাঁশ ঝড়ের দিকে। তখনও বাঁশ সমন্ধে আশা করি এতটাও পরিচিত আমি নই সেটা গপ্পো শুনেই আন্দাজ করা নিছক শক্ত কাজ নয়। দুই পালোয়ান একটা মোটামুটি রকমের কাঁচা বাঁশ কেটে তো ফেললাম কিন্তু টেনে আর মোটেই বাইরে বের করতে পারছিনা। তখন ওই সবাই যা করতেন আপনারা আমার জায়গায় থাকলে ওটাই হলো নবজাতকের! আমরা বাঁশ টা থেকে বাতা শিরা বের করে ধনুক বানানো যায় এরকম একটা মাপের চাইতে একটু বেশি করে করলাম এবং নেহাতই পালোয়ান স্বভাবত একটা উচ্ছ্বাসের স্ববিকটহাস্যে দুজন হন হনিয়ে ফিরে এলাম বাড়ি! ছোটবেলার সেই অবাধ স্বাধীনতা তাই এখনো বোধ হয় চায় আমি এরম আরও দুর্ঘটনা ঘটাতে সন্তর্পণে ভুল কাজ বলে না ভবি! আমরা অবশেষে দুটো শিরদাঁড়া খুব কষ্ট আধপৌ করা দুটো ধনুক তো বানিয়ে ফেললাম এবারে সেটাকে গলাতে ঝুলিয়ে সেই মীর্জা দাদ্দু পোজ দেওয়ার পালা। ভাবলাম এখনই শুরু করি আমি আর খুড়ো সেই জন্তুর মন্তরের অবাস্তব বর্ণমালার উল্লুক মোকাবিলা। কিন্তু এখন এগুলো কে একটু জল ঘাটে ডুবিয়ে রাখাটা জরুরি। আবারও বলি ছোটোবেলায় বাপি থাকতেন সহসা ব্যস্ত নিজের ব্যবসা নিয়ে, বাপি কে প্রায় তেরো চোদ্দ বছর দিনের বেলায় খুব কম দেখেওছি বলে আমার ধারণার বাইরে, সুতরাং বাড়িতে আর যাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন তাঁদের সবার ই একটাই কর্তব্য অঘটন না ঘটা পর্যন্ত আমার সমন্ধে কোনো নালিশ হয়েছে বাপি র কানে এটা খেয়াল রাখা। এছাড়াও অত্যন্ত জরুরি যে দায়িত্ব ছিল সেটা হলো নিজেদের অবস্থান বুঝে আমার সমন্ধে নালিশ করে নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা গুলোর হাত থেকে বাঁচতে পারা! তাই খুল্লোম খুল্লা ভাবে আমি আর আমার খুড়ো সারা বাড়কুনারপুর গ্রাম দাপিয়ে বেড়াতাম। মাঝে মধ্যে ছাড়া বাকি সময় গুলো আমার সঙ্গে খুড়োর ই একমাত্র রাজা আর প্রধান মন্ত্রী বা প্রধান যোদ্ধার সম্পর্ক রইত। আমাদের প্রধান শত্রু ছিল গোপাল সাউ॥ ছোট বেলার এই শত্রুকে আমরা ভাগ করে দিয়েছি তার রাজ্য তাই যখনই তার সৃষ্ট কোনো ভালো জিনিস আমাদের যৌথ প্রকল্পের ধজ্জিয়া উড়াতে চাইতো সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রধান মন্ত্রী খুড়ো র সঙ্গে মিলে আমরা তাকে সমেত তাঁর উন্মুখ (অবশ্য আমাদের থেকে অনেক গুণে ভালো) জিনিস উড়িয়ে দিতাম! হতে পারে সেটা কোনো সাধারণ মাইক সেট বা হতে পারে দিওয়ালি ঘর অথবা মা কালী র বিশেষ প্যান্ডেল! সেদিন আমাদের টার্গেটে ছিল গোপালের (সাউ) দিওয়ালি ঘর! গ্রামের সবাই মুখ ভর্তি প্রশংসায় পরিপূর্ণ, আর আমরা দুটো খেচর সেই জায়গায় বানিয়েছি মাত্র ধ্যাকর দুটো ধনুক আর তাদের পেতে খাঁচতে পারা কোনরকমের গোটা চার পাঁচেক শত শতাব্দীর কাঠী!
মন্ত্রীর সঙ্গে বসে আলোচনা হলো ঠিক সন্ধ্যা সাত টা বাজলেই ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার নামবে, গ্রামের কোনো মানুষ তো দূরের কথা ওই আলোয় আলোকিত দিওয়ালি ঘরের কাছে কনকনে ঠান্ডার পরিবাহে মরার জন্য একটা কীট পতঙ্গও উড়ে আসবেনা, ঠিক তখন মহারাজ আর মন্ত্রী দুজন হামলা করবে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড় খার করে দেবে নিষ্পাপ তালু দ্বারা তৈরি এত্ত প্রশংসিত দিওয়ালি ঘর।
খাওয়া দাওয়ার পর দুজনে প্রায় সন্ধ্যে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ উঁকি মেরে বসে রইলাম ভিড় কমার অপেক্ষায় আমার জ্যেঠু বাড়ির হরি মঞ্চের পেছনে। ওখান থেকে গোটা গ্রাম টা দেখা যায় কোথায় কী হচ্ছে, কার বাড়িতে শেষ আলো টা নিভবে। এই সব আর কি! যাই হউক এখন ফেরা যাক আসল ঘটনায়! সবাই যাওয়ার পরে অন্ধকার ভেদে আমি আর মন্ত্রী একেবারে দিওয়ালি ঘরে দেড় হাত মতো দূরে চলে গেলাম, কারণ আমাদের রুগ্নতিকায় ধনুকের বান ঠিক ততখানি দুর ই মাপতে পারে তাঁর দীর্ঘ লম্ফন! আমরা আমাদের বান তাক করেছি ঠিক এমন সময় একটা খরাং করে শব্দ হলো আর আমার ধনুকের দড়ি টা ছিঁড়ে যেতেই পাতলা বাতা টি আমার বাঁ চোখের উপরে ঝটাং করে লাগলো। আমার এই ঘটনায় আমি তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান! খুড়ো তখন তার গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে দীর্ঘ লম্ফন এবং অর্ধ অতিকায় লম্ফন দিয়ে বাড়ি পালিয়েছে। অবশ্য মার বিশ্বাস আজ পর্যন্ত কোনো পৌরাণিক যুদ্ধে মহারাজের পিঠ বাঁচানো এভাবে আপাতত হয়নি। গ্রাম জোড় করা লোক, আমার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন রকমের টিপস দিতে লাগলেন পরের দিন সকাল হলেই বাপি বরাবরের মতো তাঁর কর্তব্য পরিপালন করলেন, মেদিনীপুর নিয়ে গিয়ে চোখের ভেতরে থাকা রোয়া বের করে আনা হলো এবং দিন পনেরো আমার চোখে একটা কালো চশমা নামক বস্তু আকৃষ্ট হয়ে দ্বারস্থ হতো।
এর পরে দীর্ঘ দিন চলে গেলো। কোনো সমস্যাই নাই! আমি কিছুদিন আগে বুঝলাম ছোটবেলার সেই দুর্ঘটনার কিছু আঁচ আমার চোখে এখনও গভীর সমস্যা শুরু করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই আমি চোখের কোনো চিকসা ছাড়াই দুটো চেঞ্জার চশমা কিনলাম। দেখলাম একটা আমি রেখে দেবো আর একটা আমি দৈনন্দিন পরে ব্যবহার করব। সত্যি বলতে চশমা দুটো আমায় অনেক সহযোগিতা করে, রাতের বেলায় বাইক চালানোর সময় অন্য গাড়ির সাদা আলোয় আমার আর চোখ ঝলসে যায়না, আবার দিনের বেলায় আমি যখন খালি চোখে বাইরের দিকে তাকাতে পারিনা তখনও আমায় ওরা সাহায্য করে থাকে। আজকে বাড়িতে আমার অফিস কামাই করে যখন দেখলাম পরিষ্কার করার সময় আমার স্বযত্নে রাখা টেবিলের ভেতরে ঢুকে ইঁদুর ভালো চশমা টার প্রায় প্রায় বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দিয়েছে, তখন আমার রাগ চরম শিখরে তার পরে ভাবলাম, সঞ্চয় আমরা করা বা কিসের জন্য করব? যেখানে আমরা নিজের ভবিষ্যতেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চিন্তা ভাবনা করতে ব্যস্ত সেখানে বর্তমান অবিরাম চিৎকার করে বলে চলেছে আমি আমার কর্তব্য পালন করে চলেছি, অন্যকে দেখে শেখ কিন্তু নিজের মনের কৌতূহল গুলোকে আজকেই প্রাধান্য দাও। সঞ্চয় অতীতের ঘটনা গুলোই হউক, বর্তমান সময় কে আনন্দ উপভোগ করার পেছনেই ব্যয় করে দেখো একবার কারণ ভবিষ্যৎ না ও আসতে পারে বাঁচার জন্য তার অবজ্ঞা আমিই প্রতিশ্রুতি দ্বারা প্রমাণিত।
ধন্যবাদান্তে - @pms
Comments
Post a Comment